বিকাল ৩ টার দিকে সবাই যখন দুপুরের খাবার খেয়ে ঝিমুচ্ছে, আমি তখন আমার দরজার চৌকাঠে কান খাড়া করে বসে আছি। দুপুরের এই সময়টা যেন কেমন ঝিম ধরা। প্রচন্ড গরমে সবাই কাহিল। হাত পাখা দিয়ে মা ঘুমের মাঝেই নিজেকে বাতাস করছে। ফ্যানটির পাখাও ঠিক মতন ঘুরছে না। আমি খালি গায়ে আর হাফ প্যান্ট পড়ে অধির আগ্রহে বসে আছি। কখন শুনবো সেই শব্দ ? আজকে কি আসবেনা?
গরম কালে আমাদের ছোট্ট টিন শেডের বাড়িটা যেন দুপুর বেলা আগুনের কুন্ড হয়ে যেত। আমি এই সময় হয় ইস্কুলের হোম ওয়ার্ক করি, নয়ত ছবি আকার চেষ্টা করি। মা আমার জন্যে জল রঙের ছোট্ট একটি বক্স কিনে দিয়েছিল। বাবা ছাড়া সংসার।মা অনেক হিসেব করে সংসার চালাতেন। অনেক কম বয়স থেকেই বুজতে পেরেছিলাম মার কাছে কিছু চাওয়া যাবেনা। মা কখনও না করতেন না, কিন্তু ঐ ছোট্ট বয়সেও বুজতে পারতাম মার চোখের সেই অসহায় চাহনি। সেই মুহূর্তে গলার ঠিক নিচে কি যেন শক্ত একটা দলা পাকিয়ে উঠতো। মার সাথে একদিন রোজকারি দোকানে গিয়েছিলাম আমি। আমার চোখ আটকে গেল একটা রঙের ছোট বাক্সের উপর। কি সুন্দর রঙ!!! বেগুনি রঙ আমার খুব ভালো লাগতো। আমি ফিসফিস করে বললাম...মা, আমাকে এটা কিনে দিবে?
মা কয়েক মুহুর্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দোকানি ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন.....ভাই, এর দাম কত?
দোকানি ভাই বলল ৩৫ টাকা।
৩৫ টাকা !!!...ওহ...এত্ত দাম বুঝি ! আমার বুঝতে আর বাকি রইলনা যে এই সুন্দর রঙিন বাক্সটা আমার হবেনা। কারন আমি জানতাম আমাদের দৈনিক খরচ ৩০টাকা। নানাভাই হিসেব করে দিয়েছিলেন মাসে ৯০০ টাকা দিয়ে আমার মাকে আমাদের সংসার চালাতে হবে।
মা আস্তে করে বলল....দিন....
আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না...মা আমাকে ঐ রঙের বাক্সটা কিনে দিল!!!
সেটি ছিল জল রঙের একটি ছোট বাক্স। আমি মেঝেতে টিউব থেকে রঙ ঢেলে ঢেলে পানি দিয়ে মিশিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করতাম। আজও আঁকার চেষ্টা করছি। কিন্তু মন দিতে পারছিনা......আজকে কি তাহলে আসবেনা!!!!
আমি উঠে দাড়ালাম। দৌড়ে নানাবাড়ীর প্রধান গেটের কাছে চলে এলাম। নানাবাড়ির দেয়ালটা ছিল অনেক চওড়া। তার মাঝে ছিল অনেক গুলো খাঝ। দেয়ালে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে আমার অনেক ভাল লাগতো। আমি দেয়ালের উপর যেখানে বড় লাইট থাকে তার ছাদের উপর বসে পা ঝুলিয়ে বসে আসি। প্রচন্ড গরমে সময় যেন থমকে আছে......আহ...কখন আসবে? গলার ভিতরতা শুকিয়ে কাঠ।
টূ...টুং...টুং................ ..আহ!! ঐতো...আমি দেয়াল থেকে লাফ দিলাম। উফফ...রাস্তার পিচ যে গলে গরম হয়ে আছে তা খেয়াল করিনি। আমি খালি পায়ে রাস্তের উপর দৌড়াতে থাকি। উনি বাঁয়ের গলিতে আছে। টূ...টুং...টুং শব্দ গুলো তো ওখান থেকেই আসছে!!!...আমি বায়ে মোড় নিতেই তাকে দেখতে পেলাম।
ঐতো!!...কি সুন্দর ২ চাকার গাড়ি। মানুষটি ঐ দুই চাকার গাড়িটা কি সুন্দর ঠেলে নিয়ে আসছে। ইস...আমার যদি একটা এমন গাড়ি থাকতো!...আমি দৌড়ে ছোট্র টুং টুং গাড়িটার কাছে এসে থামলাম...হাপিয়ে গেছি এই তীব্র গরমে। বুকের ভিতরটা ঢিপ ঢিপ করছে তা দিব্যি টের পাচ্ছি।...ফিস ফিস করে বললাম...আছে ঐটা...কমলা রঙের টা ?
লোকটি বলল... আছে...৫০ পয়সা!!!
আমি আস্তে করে আমার পেন্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি সতর্কভাবে..আধুলিটা আছেতো ? আছে..আছে..ঐতো..হাতে বাজলতো!!! আমি পকেট থেকে আধুলিটা বের করে তাকে দিলাম। মানুষটি এক ঝটকায় ঢাকনা খুলতেই আমার মুখে হীম শীতল বাতাসের এক ঝাপটা লাগল!!!
বুবুনকে দেখা যায় দেয়ালে পা ঝুলিয়ে মনের আনন্দে কমলা রঙের আইস্ক্রিম খাচ্ছে...তার চোখে মুখে আনন্দ......জীবনের সকল সুখ যেন ভাদ্র মাসের এই গরমে দেয়ালে পা ঝুলিয়ে নারিকেল গাছের ছায়ায় কমলা রঙের আইসক্রিম খাওয়া...
মোহাম্মাদ শিহাব উদ্দিন
১৩ ই মার্চ
No comments:
Post a Comment