Saturday, 7 March 2020

আমার বড়মামা

জীবন আসলে এইরকমই। বিকাল ৪টার দিকেও বড়মামা ঠিক ছিলেন শুনেছি। সাড়ে ৫টায় মারা গেলেন। সারাদিন দীপ্ততে থেকে বাসায় ফিরে সন্ধার দিকে একটু ঘুমিয়ে পরেছিলাম। তারপর ছোট মামার ফোন। তারপর মামার বাসায় যাওয়া, সেখান থেকে দাফন শেষে বাসায় আসতে আসতে রাত ১১টা। কবরে নেমে লাশ নামিয়েছি অনেকবার হল। তাই এই বিষয়ে নিজেকে বেশ অভিজ্ঞই বলা যায়......
বড়মামার সাথে স্মৃতি সেই অর্থে তেমন নেই। মানে হল, বরাবরই প্রচন্ড ভয় পেতাম আমরা সকলেই, তাই স্বাধারনত সামনে পরতে চাইতাম না। আড়ালেই থাকতাম। যখন আমি লম্বা চুল রাখতে শুরু করি, শুনলাম বড়মামা আমাকে খুজছেন....আমাকে ধরবেন..... আমি আর সেই পথ মাড়াইনি বহু দিন!!!!!!!!!!!!!
মানুশটি ছিলেন অসম্ভব হ্যান্ডসাম। শোনা যায় উনি সেই আমলে মামিকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। হাহা... একদম হিরো টাইপ আসলে!!!!!! সব মানুশরই দোষ ত্রুটি থাকে। একসময় এই মানুশটি শুধুমাত্র জিদের বসে গৃহত্যাগ করলেন, সংসার ত্যাগী হলেন। প্রায় ১৭ বছর পরে তাকে সংসারে ফিরিয়ে আনার মাত্র ২ সপ্তাহের মাঝেই উনি চলে গেলেন!!!!!!
দাফন শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম... বড়মামার সাথে আমার কোন স্মৃতি মনে পড়ে বা মনের গহীনে যেটি আমাকে এখন ভাবায় বা আনন্দ দেয়। অদ্ভুদ ভাবে ২টি ঘটনা সামনে চলে এল।
১. আমার বাবা তখন সদ্যই মারা গেছেন সৌদিতে। মাত্রই পুরো ফেমিলি ইরাক থেকে ফিরে বাবা কিছুদিন থেকে এবার সৌদি গেলেন। আমার তখন ৪ বছর। নানার বাড়ি লালমাটিয়ায় আর দাদার বাড়ি পশ্চিম রাজাবাজার। বাবা মারা যাবার পরে যখন আমার মা আর ৩ ভাই-বোনদের যায়গায় কোথায় হবে বা আমরা আদও একসাথে থাকতে পারব কিনা দাদার বাড়ি, বিশাল একান্নবর্তি পরিবারে এই ৪ জনের জায়গা আদও হবে কি হবে না...এই নিয়ে অনেক কিছুই হচ্ছিল যা বড় হবার পরে বুঝতে পেরেছি। এরই মধ্যে একদিন দেখলাম ঝাকড়া চুলের ফর্সা এক মানুশ এক মোটর বাইক নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি জানলাম উনি বড় মামা। মামা আমাকে আর সম্ভবত আমার বড় ভাই-বোনকেও মটর বাইকে উঠালেন। মামার পিছনে কে উঠেছিল, জানিনা...কিন্তু মামা আমাকে সামনের তেলের টাংকির উপরে বসালেন। আমার জীবনের প্রথম মোটর সাইকেলে চড়া। মামা আমাদেরকে বা আমাকে নিয়ে লালমাটিয়ায় চলে এলেন। সেটিই ছিল চিরজীবনের জন্যে দাদার বাড়ি ছেড়ে নানার বাড়িতে ফিরে আসা। নানাবাড়ি ছিল এক স্বপ্নের মত। চারিদিকে গাছ-গাছালি, আম, জাম, কাঁঠাল, বড়ই, বিশাল পেয়ারা গাছে সারা বাড়ি প্রায় জংগলের মত। অনেকগুলি খালা, আর বড় মামার ২ ছেলেকে পেলাম যারা আমরা একই বয়সের............
তাই ছোট্র আরিফ মামার বাইকে তেলের টাংকির উপরে বসে বাতাস খেতে খেতে নানা বাড়ি যাচ্ছে... এইটি আমার বড়মামার সাথে এক আনন্দময় ঘটনা।
২. বড়মামা ছিলেন ডাকাবুকা মানুশ। নাটকে অভিনয় করতে দেখেছিলাম ছোটবেলায়। মামা শিল্পীও ছিলেন। সেই ছোটবেলায় উনাকে দেখতাম রঙ তুলি নিয়ে কিছু করছেন। আর কি সুন্দর লেটারিং করতে পারতেন!!!!!.আমার শিল্পী হয়ে উঠার পিছনে ছোটবেলার এইসব ঘটনাও অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। আর মামার আরেকটি শখ ছিল। সব সময় কি কি জানি বানাতেন, গবেষণা করতেন। উনার ঘরে লোহা লক্করের অনেক কিছু দেখতাম। কিন্তু যে জিনিসটা একদম মনে গেথে আছে...সেটা হল... বড়মামা রঙ্গীন কাগজ কিনে ঘুড়ি বানাতেন!!!!!!! একদিন দেখি উনি ঘুড়ি বানাচ্ছেন......কি সুন্দর সুন্দর রঙ্গিন সেই সব ঘুড়ি। এত্ত বড় লেজও জুড়ে দিয়েছিলেন। কখন সেই ঘুড়ি হাতে পাবো আর অল্প সুতা লাগিয়ে দৌড় দিব...সেই লোভে ফোকলা দাতে হা করে থাকতাম। তারপর হাতে ঘুড়ি পেয়ে সারা নানা বাড়ি দৌড়ে বেড়াতাম!!!!!! মাথা বাকিয়ে পিছন ফিরে দেখতাম সেই রঙ্গীন ঘুড়ি আমার সাথে সাথে উড়ছে!!!!
আপাতত এই। কোকড়া চুলের সার্টের বোতাম খোলা হিরোর মত আমার বড়মামা আমাকে নিয়ে মটর সাইকেলে নিয়ে আসছেন আর আমি হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছি... আর রঙ্গীন ঘুড়ি দৌড়ে দৌড়ে উড়াচ্ছি... এই সুন্দর দুই স্মৃতি থাকুক সারা জীবন।
আমার পরবর্তি শর্টফিল্মে উপরের দুটি ঘটনার একটি 'দৃশ্য' হিসেবে থাকবে। নির্মাতা তার কর্মে কোথাও না কোথাও নিজেই থাকেন। এখানেও তাই হবে।
বড়মামার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। উনি যেন শান্তিতে থাকেন। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে মাফ করে দেন।
ইন্না লিল্লাহে অইন্নে ইলাইহে রাজেউন।

Saturday, 7 July 2018

বিশ্বকাপ ভাবনা

- আপনি খেলা দেখেন ? - জ্বী - কোন দল সাপোর্ট করেন ? - আর্জেন্টিনা... - বলেন কি ? ৩২ বছরেও কাপ পায়নি... - সাপোর্ট করার সাথে কাপের কি সম্পর্ক ? - না, মানে , আমাদের ৫ টা !! বুঝলেন না ব্যপারটা!! - ওহ, আপনি ব্রাজিলের সমর্থক ? - হে, হে ... জ্বি, ৫ টা ভাই... এইবার হেক্সা হবে... ( দাত খুঁচাতে খুঁচাতে) ভাই, আমাদের দলে আসেন। ভাল থাকবেন। এইবার কাপতো আমাদের!! - আপনাদের দলে কি জন্যে আসব ? - না মানে আমাদের ৫ টা... - ভাই, শুনেন... জীবনে কখনও প্রেম করেছেন?... প্রথম প্রেম বুঝেন ?... - এর সাথে প্রেম পিরিতি নিয়া আসলেন ভাই ? - না আনিনি... শুধু আপনাকে বোঝাতে চাইছি। প্রথম গভীর প্রেম যেমন ভোলা যায়না... দ্বিতীয়টাও ভোলা যায়না। আমার কাছে আর্জেন্টিনা মানে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়... সব। তাই, দয়া করে ঐ ৫ তারকা সুন্দরীর দেহবল্লরীর লোভ দেখাবেন না। - ও...... হুম... মানে বলছিলাম কি......আমাদের ৫টা, এইবার হেক্সা হবে... - ভাইরে, আপনি আপনার ঐ ৫ জায়গা মতন ঢুকিয়ে রাখেন। পারলে আপকামিং ঐ হেক্সটাকেও ঢুকান। যা ইচ্ছে তাই করুন। আমাকে শুনাচ্ছেন কেন? - না মানে, আপনাকে একটু খেলাটা বোঝাতে চাচ্ছি - আমি আপনার কাছে খেলা শিখতে চাইছি? - মানে ৫ টা আরকি... - শালার পুত, তোকে তো বলছি তুই তোর ঐ ৫ তোর জায়গায় ঢুকিয়ে রাখ!!!! - ভাই, গালাগালি করলেন?... খেলাটা একটু শিখাতে চাচ্ছিলাম... এই জন্যেই মুরুব্বিরা বলে, বাঙ্গালিকে উপকার করতে নেই। - ভাইরে, আপনি জার্মানিকে শিখান। আপনাদের খুব কাছেই আছে ওরা, ৪টা... আপনি বরং তাদের সাথে আলাপ করেন। আর গতবারের ঘটনা...... - ভাই কি কিছু মনে করিয়ে দিতে চাইলেন ? - না ভাই, খালি বলছিলাম, অতীত থেকে শিক্ষা নেন। এত পকপক কইরেন না... - মানে ... ইয়ে... সত্যি কথা বলতে, জার্মানির সাথে কথা বলে মজা পাইনা... কেমন যেন রসকস নাই। - ভাই, আপনাদের সত্যিকারের কম্পিটিটর হল জার্মানি। আর আপনারা কিনা মাত্র দুইবারের চ্যাম্পিয়নের সাথে প্রতি পদে পদে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে আসেন!!! - হুম, ভাই... আপনাদের সাথে ঝগড়া না করলে এই খেলার মানে কি? - মানে?... আপনার কাছে বিস্বকাপের চাইতেও আমাদের সাথে ঝগড়া করা অনেক বড় ব্যাপার? - মানে... না... ঠিক তা না... তবে, মানে...ইয়ে... আপনাদের না খোঁচালে যে রাতে ঘুম আসবেনা না... - হুম...... বুঝলাম... - কি বুজলেন ভাই!!! - সমস্যা তো মাথায়!! - মাথায়? - জ্বী... - কার? - জানিনা ভাই... - ভাই, বুজলেন... আমরা কিন্তু ৫ টা... এইবার হেক্সা হবে... মাথা বন বন করে ঘুরছে... কেমন করে ঐ হেক্সা তার জায়গা মত ঢুকানো যায়...সেটা ভাবতে ভাবতেই.................. ক্রিং...ক্রিং... ক্রিং

Friday, 24 March 2017

জীবন থেকে নেয়া BD Animated life -০১

দীর্ঘ সময় ধরে studio তে কাজ করার সময় প্রায় শুনতাম artists রা এই দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থাকে দায়ী করত তাদের ভাল কাজ করার বা না করতে পারার পিছনে ( সবাই না তবে বেশির ভাগই)...যখনই খুব inspire করতাম.........এইটা কর, ঐটা কর...আরো ডেভেলপ কর......তখনই পিছনে টেনে ধরার নানা কাহিনী শুনতে পেতাম......এই দেশে অনেক কিছুই নাই...আরে, আমাদের কি গাড়ি বাড়ি আছে?...ওদের সবার দামি গাড়ি আছে...চালিয়ে চালিয়ে অফিসে আসে!!!!!!! কত কত কাহিনী!!! আমি বলতাম...এর সাথে `ভাল কাজ করার` সম্পর্ক কি?...আবারো কথা বাড়তে বাড়তে সেই রসুনের গোড়ায় গিয়ে ঠেকতো......আরে ওদের জীবনের যে মান!!!!!
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে আসতাম...অথচ, এই সাধারন জিনিসটাই বুঝল না যে ধনী হোক, গরিব হোক সবাইকে এই কাজ শিখতে হয় প্রচুর সময় দিয়ে নিজের ইচ্ছায় আর টুল বলতে সেই কম্পিউটার আর একটা টেবিল......তো আপনি ভেঙ্কুভার এ বসেন আর গুলিস্তানে বসেন...আপনার work station কিন্তু সেই Wacom, PC আর Table. ইছাশক্তি না থাকলে আপনাকে কেও টেনেও কাজ শেখাতে পারবেনা আর ইচ্ছা শক্তি থাকলে অনেক ভাল artists হওয়া সম্ভব যার উদাহারন আশে পাশে অনেক আছে!!!... এই দেশে সবচেয়ে যে সুবিধা তা হল সারা দুনিয়ার সমস্ত সফটওয়ার আর টিউটোরিয়ালের সুবিধা ( এখন পর্যন্ত) যা বিশ্বের উন্নত সব দেশেই পেতে গেলে আপনাকে বিশাল অঙ্কের টাকা গুনতে হবে... আর You Tube তো আছেই!!...এখন YouTube এ যে পরিমান animation/cg/vfx এর open resource আছে তা চিন্তাও করা যায়নি মাত্র ৬/৭ বছর আগে!!!...
অনেক কিছু লিখলাম কারন এত বছর পরেও বাংগালির চিন্তার পরিবর্তন হয়নি...এখনও সেই same excuse...আরে ভাই...ঐ দেশে দেখছেন কি সুন্দর আবহাওয়া...কি সুন্দর ঠান্ডা...ওদের মাথা ঠান্ডা...আমাদের দেশে আসত...তখন দেখতাম তারা কেমনে করত!!!!!!!!!! অথচ এই দেশেই যখন আমার জার্মান বান্ধবী আমাদের সাথে প্রায় ১ মাস কাজ করল তখন খুব কাছ থেকে দেখেছি কি পরিমান concentration আর dedication দিয়ে প্রায় ৮/৯ ঘন্টা টানা কাজ করে গেছে...যখন বললাম... কি ভাবে পারো?.... উত্তর আসলো......Full concentration দিয়ে কাজ না করলে এই কাজ করে কিভাবে?...উত্তর দিলাম না।
( বাঙালিকে শেষ করল তার অন্যের গাড়ি আর টাকার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতে আর সব সময় lame excuse show করে অন্যের উপর দায় চাপাতে)

Sunday, 12 March 2017

বুবুনের গ্রীষ্মের দুপুর

বিকাল ৩ টার দিকে সবাই যখন দুপুরের খাবার খেয়ে ঝিমুচ্ছে, আমি তখন আমার দরজার চৌকাঠে কান খাড়া করে বসে আছি। দুপুরের এই সময়টা যেন কেমন ঝিম ধরা। প্রচন্ড গরমে সবাই কাহিল। হাত পাখা দিয়ে মা ঘুমের মাঝেই নিজেকে বাতাস করছে। ফ্যানটির পাখাও ঠিক মতন ঘুরছে না। আমি খালি গায়ে আর হাফ প্যান্ট পড়ে অধির আগ্রহে বসে আছি। কখন শুনবো সেই শব্দ ? আজকে কি আসবেনা?

গরম কালে আমাদের ছোট্ট টিন শেডের বাড়িটা যেন দুপুর বেলা আগুনের কুন্ড হয়ে যেত। আমি এই সময় হয় ইস্কুলের হোম ওয়ার্ক করি, নয়ত ছবি আকার চেষ্টা করি। মা আমার জন্যে জল রঙের ছোট্ট একটি বক্স কিনে দিয়েছিল। বাবা ছাড়া সংসার।মা অনেক হিসেব করে সংসার চালাতেন। অনেক কম বয়স থেকেই বুজতে পেরেছিলাম মার কাছে কিছু চাওয়া যাবেনা। মা কখনও না করতেন না, কিন্তু ঐ ছোট্ট বয়সেও বুজতে পারতাম মার চোখের সেই অসহায় চাহনি। সেই মুহূর্তে গলার ঠিক নিচে কি যেন শক্ত একটা দলা পাকিয়ে উঠতো। মার সাথে একদিন রোজকারি দোকানে গিয়েছিলাম আমি। আমার চোখ আটকে গেল একটা রঙের ছোট বাক্সের উপর। কি সুন্দর  রঙ!!! বেগুনি রঙ আমার খুব ভালো লাগতো। আমি ফিসফিস করে বললাম...মা, আমাকে এটা কিনে দিবে?

মা কয়েক মুহুর্ত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে দোকানি ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন.....ভাই, এর দাম কত?
দোকানি ভাই বলল ৩৫ টাকা।

৩৫ টাকা !!!...ওহ...এত্ত দাম বুঝি ! আমার বুঝতে আর বাকি রইলনা যে এই সুন্দর রঙিন বাক্সটা আমার হবেনা। কারন আমি জানতাম আমাদের দৈনিক খরচ ৩০টাকা। নানাভাই হিসেব করে দিয়েছিলেন মাসে ৯০০ টাকা দিয়ে আমার মাকে আমাদের সংসার চালাতে হবে।

মা আস্তে করে বলল....দিন....

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না...মা আমাকে ঐ রঙের বাক্সটা কিনে দিল!!!
সেটি ছিল জল রঙের একটি ছোট বাক্স। আমি মেঝেতে টিউব থেকে রঙ ঢেলে ঢেলে পানি দিয়ে মিশিয়ে ছবি আঁকার চেষ্টা করতাম। আজও আঁকার চেষ্টা করছি। কিন্তু মন দিতে পারছিনা......আজকে কি তাহলে আসবেনা!!!!

আমি  উঠে দাড়ালাম। দৌড়ে নানাবাড়ীর প্রধান গেটের কাছে চলে এলাম। নানাবাড়ির দেয়ালটা ছিল অনেক চওড়া। তার মাঝে ছিল অনেক গুলো খাঝ। দেয়ালে উঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে আমার অনেক ভাল লাগতো। আমি দেয়ালের উপর যেখানে বড় লাইট থাকে তার ছাদের উপর বসে পা ঝুলিয়ে বসে আসি। প্রচন্ড গরমে সময় যেন থমকে আছে......আহ...কখন আসবে? গলার ভিতরতা শুকিয়ে কাঠ।

টূ...টুং...টুং..................আহ!! ঐতো...আমি দেয়াল থেকে লাফ দিলাম। উফফ...রাস্তার পিচ যে গলে গরম হয়ে আছে তা খেয়াল করিনি। আমি খালি পায়ে রাস্তের উপর দৌড়াতে থাকি। উনি বাঁয়ের গলিতে আছে।  টূ...টুং...টুং শব্দ গুলো তো ওখান থেকেই আসছে!!!...আমি বায়ে মোড় নিতেই তাকে দেখতে পেলাম।

ঐতো!!...কি সুন্দর ২ চাকার গাড়ি। মানুষটি ঐ দুই চাকার গাড়িটা কি সুন্দর ঠেলে নিয়ে আসছে। ইস...আমার যদি একটা এমন গাড়ি থাকতো!...আমি দৌড়ে ছোট্র টুং টুং গাড়িটার কাছে এসে থামলাম...হাপিয়ে গেছি এই তীব্র গরমে। বুকের ভিতরটা ঢিপ ঢিপ করছে তা দিব্যি টের পাচ্ছি।...ফিস ফিস করে বললাম...আছে ঐটা...কমলা রঙের টা ?

লোকটি বলল... আছে...৫০ পয়সা!!!

আমি আস্তে করে আমার পেন্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি সতর্কভাবে..আধুলিটা আছেতো ? আছে..আছে..ঐতো..হাতে বাজলতো!!! আমি পকেট থেকে আধুলিটা বের করে তাকে দিলাম। মানুষটি এক ঝটকায় ঢাকনা খুলতেই আমার মুখে হীম শীতল বাতাসের এক ঝাপটা লাগল!!!



বুবুনকে দেখা যায় দেয়ালে পা ঝুলিয়ে মনের আনন্দে কমলা রঙের আইস্ক্রিম খাচ্ছে...তার চোখে মুখে আনন্দ......জীবনের সকল সুখ যেন ভাদ্র মাসের এই গরমে দেয়ালে পা ঝুলিয়ে নারিকেল গাছের ছায়ায় কমলা রঙের আইসক্রিম খাওয়া...

মোহাম্মাদ শিহাব উদ্দিন
১৩ ই মার্চ

Friday, 2 September 2016

পান্তু আর ভুতুমের পরিচয় পর্ব

এই....তুই কেরে ?....


পান্তু মনের আনন্দে গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে ঘাসের ডগা চিবুচ্ছিল। তখন সে দেখতে পেল ভুতুম দুনিয়ার এক রাশ দু:খ নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাকে ডিংগিয়ে গেল।

এই.....তুই কে ? পান্তু মহাবিরক্ত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করে।

ভুতুম চমকে উঠে থেমে গেল। আশেপাশে তাকাল। ভুতুম দেখে একটি সবুজ রঙের মানুষ গাছে হেলান দিয়ে ঘাস চিবুচ্ছে.......মানুষ ? সে কোথায়? সে কি তাহলে ভুল করে........ভুতুম আর কিছু ভাবতে পারলনা।

ভুতুম ভয়ে ভয়ে উলটো জিজ্ঞেস করল.......তু.....তু......তুই কে ? ...

এবার পান্তুর অবাক হবার পালা। তাকে জিজ্ঞেস করছে সে কে ? তাকে ? এই পান্তুকে ? পান্তু মেজাজ খারাপ করে বলল...... তুই আমাকে উলটো জিজ্ঞেস করছিস আমি কে ? তাও আবার নাকি গলায়?

আমার গলা নাকি!!!!...অমা তুই কি বললি...আমাকে সবাই কত কদর করে আমার মিষ্টি পাখির মত গানের গলা নিয়ে....আর তুই বললি নাকি !!!!

ভুতুম কে দেখে মনে হচ্ছে সে এখনেই কেঁদে ফেলবে। পান্তুর একটু মায়া হল। চোখ কচলে বলল.... এই তোকে এমন ঝাপসা লাগছে কেন !

এবার ভুতুমের মনে আর কোন সন্দেহ রইল না। সে ভুল করে মানুষের রাজ্যে ঢুকে পড়েছে। এটা কেমন করে হল!!! কেমন করে হল এসব!!! সে ভুল করে তার অপাসিটি কমাবার কথাও ভুলে গেছে ! সে তার হাতে ডায়ালে দেখল অপাসিটি ৩০%......যা শুন্য হবার কথা! তার প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে এখনই ভে করে কেঁদে ফেলবে। কিন্তু এই অদ্ভুত সবুজ মানুষের সামনে একেবারেই কান্না করা যাবেনা। একদমই না!! তাহলে তো ভুত সমাজে একদমি মুখ দেখাতে পারবেনা!! এমনিতেই আজকে যা হল!!....বিকালের কথা মনে পড়ে ভুতুমের ভিতরটা হাহাকার করে উঠলো। এই কষ্ট সহ্য করতে পারিনি বলেই তো সে আজকে গ্রাম ছেড়ে......তার উপর ঐ অদ্ভুতুড়ে সবুজ রঙের প্রাণীটা যদি মানুষ হয়...তাহলেতো সব শেষ...সব শেষ!!!!

ভুতুম একটু সাহস নিয়ে বলল....এই ? তুই একটু ভয় পাবি আমাকে? একটু ? ভাই না ভাল!!!

এবার পান্তুর মেজাজ সত্যি সত্যি চড়ে গেল। তাকে বলছে ভয় পেতে !...আবার বলছে নাকি গলায় ভাই!!!...

পান্তু ঘাসের ডগাটা ছুড়ে ফেলে বলল......ইহহ তোকে ভয় পাব কেন?...এই পান্তু কাউকেই ভয় পায়না!...তুই আমাকে চিনিস আমি কে?

ভুতুম ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড ভয় পেলেও সে আবার বলল মিনমিন করে ........তুই আমাকে ভয় পাবিনা কেন?

পান্তু বলল... কেন পাবো ?...তোকে কী ভয় পাবার কথা ?
তুই....তুই আমাকে ভয় পাবি....কারন........কারন...
কি কারন? পান্তু ভুড়ু কুচকে বলল....
কা...কা...কারন আ...আ...আ..আমি..........ভুত !!

কিছুক্ষনের জন্য সময় যেন থমকে দাড়ালো......

তুই ভুত!! হাহাহহাহাহ....পান্তু অট্রহাসিতে ফেটে পরে। পান্তু কিছুতেই তার হাসি থামাতে পারছেনা। হাহহাহাহহা...আমার সামনে একটা ভুত, তাও আবার কি বিশ্রি নাকি গলা!

ভুতুম আর পারলনা....আর পারলনা নিজেকে আটকাতে। পাহাড় প্রমান কষ্ট নিয়ে সে যে কেমন করে বেঁচে আছে তা কে বুজবে?... কে?.....

ভুতুম হু হু করে নাকি গলায় কেঁদে উঠল। ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে লাগলো। হেচকি টানতে টানতে কাঁদতে লাগলো। হেচকির মধ্যেই একটু জায়গা বের করে নিয়ে বলতে লাগলো............আমাকে যা ইচ্ছে বল...কিন্তু ভাই আমার পাখির মত গানের গলা নিয়ে কিছু বলিস না ....উ...উ.....উ......ভুতুম আবার কাঁদতে শুরু করল।

পান্তুর মনটা এবার একটু নরম হল ওর কান্না দেখে। বলল........তুই গান জানিস ?

ভুতুম মুহূর্তে কান্না থামিয়ে বলল....তুই শুনবি? শুনবি আমার গান? ভুতুম গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকে।

পান্তু বলল...ঠিক আছে....গা তো একটা গান ! শুনি.........

ভুতুম যেই না একটা গানের লাইন ধরল আর অমনি পান্তু হেসে ফেলে বলল...এটা গান ? ভুতুম যেই না আবার কান্না করার ভাব ধরল, পান্তুর মনে হল..... না থাক, যথেষ্ট হয়েছে। আর না। ভুতুম কে যথেষ্ট নাযেহাল করা গিয়েছে। আর ঐ ভয়াবহ নাকি গলার কান্না শোনার চাইতে ওর গান বরং অনেক ভালো। আর তাছাড়া, তাকে তো কেও কখনও ভাই বলে ডাকেনি......একটা ভুতই না হয়........পান্তুর মাথায় একটা সুদরপ্রসারি চিন্তা টুক করে খেলে যায়।

নাহ...যা। আর দুষ্টুমি করবোনা। চল...তোর গান শুনি। তবে এখানে না। আমি সব জায়গায় গান শুনিনা। চল এই বট গাছের ঐ মগডালে উঠি। দেখেছিস, কি সুন্দর এত্ত বড় চাঁদ উঠেছে।

ভুতুমের মনে পড়ে গেল এই পূর্ণিমা রাতের গানের আসরের জন্যেই না তার কত রাত গিয়েছে গানের রিহারসেল করার জন্যে.........আর আজ !!!!!!! ভুতুম আস্তে করে বলল .........চল......

ক্যামেরা আস্তে করে pan করে উপরে উঠবে। Close up এ বিশাল চাঁদের মাঝখানে silhouette form এ দেখা যাবে পান্তু আর ভুতুম গাছের ডালে বসে আছে। ভুতুম তার গান শুরু করল......

আমি এক মিষ্টি পাখি করি কিচির মিচির.........

ক্যামেরা ধীরে ধীরে zoom out হয়ে বিশাল বনটিকে দর্শককে দেখাবে।
সেই দিন থেকে জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট একটি গাঁয়ের লোকজন গভীর রাতে অদ্ভুদ সব শব্দ শুনতে পায়.........

মোহাম্মন শিহাব উদ্দিন
০২ - ০৯ -১৬




Thursday, 1 September 2016

আমি, ঝড় আর আম

বাহিরে তুমুল ঝড় হাওয়া বইছে। আমাদের টিনের ছাদে আম গাছের ডাল
ক্রমাগত আঘাত করছে। আমি আমার ছোট জানালাটি খুললাম। উহ ! বাতাসের
ঝাঁপটায় জানালা খুলে রাখা দায়। দূরে তাকিয়ে দেখি ঝড় হাওয়ার তাণ্ডবে
নানা বাড়ীর নারকেল গাছগুলি একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে উলটে
পালটে যাচ্ছে। আকাশের মেঘগুলি যেন গুমরে গুমরে উঠছে। মেঘ এতো কাল
হয় বুঝি ! মেঘগুলো যেন সব দল বেধে জোট পাকাচ্ছে ! গুড়ুম.....গুড়ুম...

বুবুন!!! জানালা বন্ধ কর!!! মা চিৎকার করে উঠল। 

মা....এইটা কি কালবৈশাখী ?

আমি জানালা বন্ধ করে দরজার দিকে এগুলাম। মাথায় খালি ঘুরছে আম
গাছের বড় বড় আমগুলোর কথা। দৌড়ে বাইরে চলে এলাম।

বুবুন!!!! মা ডাকল পিছন থেকে। কিন্তু আমার শোনার সময় নেই।

আমার নানা বাড়ীতে ছিল অনেক অনেক গাছ। নানা তার বাড়ির চারিধারে
নারকেল, সুপুরি গাছ দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। আর ছিল ৪টি চার জাতের
বড় বড় আম গাছ। ছিল জাম,কলা,পেয়ারা,বড়ুই আর অরবড়ুই গাছ। আমার
মার ছিল সবজি আর ফুল গাছের নেশা। ঘরের চৌকাঠ পেরুলেই আমি সব
সময় রঙিন প্রজাপতি দেখতে পেতাম......

প্রজাপতি গুলো কোথায় গেল ? উহ!!!  ঝড়ো বাতাসে লাল প্রজাপতিটা 
উড়তে পারছেনা !!! চোখের কোনা দিয়ে দেখতে পেলাম নানী টিনের ছাদ থেকে
তার তেঁতুলের ঝাঁপি নামাচ্ছে..............ঝড় আইল ঝড় !!!  

আমি দৌড়াতে থাকলাম। ওইতো....আমাদের আম গাছ। বাতাসের বেগে
আম গাছের ডাল গুলি ভেঙে যাবেতো !!...আহহ ঐ আমগুলি
পড়ছেনা কেন?  একটা যদি পড়তো!!... আজ আম খেলে নানী বকবে না!!
এ যে ঝড়ে পড়া আম....আমি লুকিয়ে পারিনি!!!....আমার আম গাছের
দোলনাটা বাতাসের সাথে সাথে দুলছে। আমি আস্তে করে দোলনায় বসে
পড়লাম। প্রচণ্ড জংলি হাওয়ায় আম গাছের তলায় আমি দোলনায়
চরছি.....বাতাসে বুনো গন্ধ। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঝড়ের মাতাল হাওয়ায় সাথে খেলতে লাগলাম।
আর ভাবছি......

একটা আম যদি পড়তো....একটা আম......

আমার নানীর চিৎকার এখনও শুনতে পাচ্ছি দূর থেকে......বাতাসে শব্দ গুলো এলোমেলো হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে...গুড়ো গুড়ো হয়ে যাচ্ছে ঝড়ের মত... 

ঝড় আইল......ঝড়...  




মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন।
২১-০৮-১৬