জীবন আসলে এইরকমই। বিকাল ৪টার দিকেও বড়মামা ঠিক ছিলেন শুনেছি। সাড়ে ৫টায় মারা গেলেন। সারাদিন দীপ্ততে থেকে বাসায় ফিরে সন্ধার দিকে একটু ঘুমিয়ে পরেছিলাম। তারপর ছোট মামার ফোন। তারপর মামার বাসায় যাওয়া, সেখান থেকে দাফন শেষে বাসায় আসতে আসতে রাত ১১টা। কবরে নেমে লাশ নামিয়েছি অনেকবার হল। তাই এই বিষয়ে নিজেকে বেশ অভিজ্ঞই বলা যায়......
বড়মামার সাথে স্মৃতি সেই অর্থে তেমন নেই। মানে হল, বরাবরই প্রচন্ড ভয় পেতাম আমরা সকলেই, তাই স্বাধারনত সামনে পরতে চাইতাম না। আড়ালেই থাকতাম। যখন আমি লম্বা চুল রাখতে শুরু করি, শুনলাম বড়মামা আমাকে খুজছেন....আমাকে ধরবেন..... আমি আর সেই পথ মাড়াইনি বহু দিন!!!!!!!!!!!!!
মানুশটি ছিলেন অসম্ভব হ্যান্ডসাম। শোনা যায় উনি সেই আমলে মামিকে নিয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন। হাহা... একদম হিরো টাইপ আসলে!!!!!! সব মানুশরই দোষ ত্রুটি থাকে। একসময় এই মানুশটি শুধুমাত্র জিদের বসে গৃহত্যাগ করলেন, সংসার ত্যাগী হলেন। প্রায় ১৭ বছর পরে তাকে সংসারে ফিরিয়ে আনার মাত্র ২ সপ্তাহের মাঝেই উনি চলে গেলেন!!!!!!
দাফন শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম... বড়মামার সাথে আমার কোন স্মৃতি মনে পড়ে বা মনের গহীনে যেটি আমাকে এখন ভাবায় বা আনন্দ দেয়। অদ্ভুদ ভাবে ২টি ঘটনা সামনে চলে এল।
১. আমার বাবা তখন সদ্যই মারা গেছেন সৌদিতে। মাত্রই পুরো ফেমিলি ইরাক থেকে ফিরে বাবা কিছুদিন থেকে এবার সৌদি গেলেন। আমার তখন ৪ বছর। নানার বাড়ি লালমাটিয়ায় আর দাদার বাড়ি পশ্চিম রাজাবাজার। বাবা মারা যাবার পরে যখন আমার মা আর ৩ ভাই-বোনদের যায়গায় কোথায় হবে বা আমরা আদও একসাথে থাকতে পারব কিনা দাদার বাড়ি, বিশাল একান্নবর্তি পরিবারে এই ৪ জনের জায়গা আদও হবে কি হবে না...এই নিয়ে অনেক কিছুই হচ্ছিল যা বড় হবার পরে বুঝতে পেরেছি। এরই মধ্যে একদিন দেখলাম ঝাকড়া চুলের ফর্সা এক মানুশ এক মোটর বাইক নিয়ে নিচে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি জানলাম উনি বড় মামা। মামা আমাকে আর সম্ভবত আমার বড় ভাই-বোনকেও মটর বাইকে উঠালেন। মামার পিছনে কে উঠেছিল, জানিনা...কিন্তু মামা আমাকে সামনের তেলের টাংকির উপরে বসালেন। আমার জীবনের প্রথম মোটর সাইকেলে চড়া। মামা আমাদেরকে বা আমাকে নিয়ে লালমাটিয়ায় চলে এলেন। সেটিই ছিল চিরজীবনের জন্যে দাদার বাড়ি ছেড়ে নানার বাড়িতে ফিরে আসা। নানাবাড়ি ছিল এক স্বপ্নের মত। চারিদিকে গাছ-গাছালি, আম, জাম, কাঁঠাল, বড়ই, বিশাল পেয়ারা গাছে সারা বাড়ি প্রায় জংগলের মত। অনেকগুলি খালা, আর বড় মামার ২ ছেলেকে পেলাম যারা আমরা একই বয়সের............
তাই ছোট্র আরিফ মামার বাইকে তেলের টাংকির উপরে বসে বাতাস খেতে খেতে নানা বাড়ি যাচ্ছে... এইটি আমার বড়মামার সাথে এক আনন্দময় ঘটনা।
২. বড়মামা ছিলেন ডাকাবুকা মানুশ। নাটকে অভিনয় করতে দেখেছিলাম ছোটবেলায়। মামা শিল্পীও ছিলেন। সেই ছোটবেলায় উনাকে দেখতাম রঙ তুলি নিয়ে কিছু করছেন। আর কি সুন্দর লেটারিং করতে পারতেন!!!!!.আমার শিল্পী হয়ে উঠার পিছনে ছোটবেলার এইসব ঘটনাও অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। আর মামার আরেকটি শখ ছিল। সব সময় কি কি জানি বানাতেন, গবেষণা করতেন। উনার ঘরে লোহা লক্করের অনেক কিছু দেখতাম। কিন্তু যে জিনিসটা একদম মনে গেথে আছে...সেটা হল... বড়মামা রঙ্গীন কাগজ কিনে ঘুড়ি বানাতেন!!!!!!! একদিন দেখি উনি ঘুড়ি বানাচ্ছেন......কি সুন্দর সুন্দর রঙ্গিন সেই সব ঘুড়ি। এত্ত বড় লেজও জুড়ে দিয়েছিলেন। কখন সেই ঘুড়ি হাতে পাবো আর অল্প সুতা লাগিয়ে দৌড় দিব...সেই লোভে ফোকলা দাতে হা করে থাকতাম। তারপর হাতে ঘুড়ি পেয়ে সারা নানা বাড়ি দৌড়ে বেড়াতাম!!!!!! মাথা বাকিয়ে পিছন ফিরে দেখতাম সেই রঙ্গীন ঘুড়ি আমার সাথে সাথে উড়ছে!!!!
আপাতত এই। কোকড়া চুলের সার্টের বোতাম খোলা হিরোর মত আমার বড়মামা আমাকে নিয়ে মটর সাইকেলে নিয়ে আসছেন আর আমি হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছি... আর রঙ্গীন ঘুড়ি দৌড়ে দৌড়ে উড়াচ্ছি... এই সুন্দর দুই স্মৃতি থাকুক সারা জীবন।
আমার পরবর্তি শর্টফিল্মে উপরের দুটি ঘটনার একটি 'দৃশ্য' হিসেবে থাকবে। নির্মাতা তার কর্মে কোথাও না কোথাও নিজেই থাকেন। এখানেও তাই হবে।
বড়মামার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। উনি যেন শান্তিতে থাকেন। আল্লাহ যেন আমাদের সবাইকে মাফ করে দেন।
ইন্না লিল্লাহে অইন্নে ইলাইহে রাজেউন।
No comments:
Post a Comment